পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে আধিপত্য বিস্তারে প্রস্তুত চীন

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ধীরে এগোচ্ছে সারা বিশ্ব।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ধীরে এগোচ্ছে সারা বিশ্ব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তিতে আগাম বিনিয়োগের মাধ্যমে সে সুবিধা নিতে যাচ্ছে চীন। গ্রিন অ্যামোনিয়া ও গ্রিন মিথানলের মতো নতুন জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশটি। তুলনামূলক বেশি খরচ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সহায়তা, বৃহৎ শিল্পভিত্তি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল চীনা কোম্পানিগুলোকে সবুজ জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য গড়ার জন্য প্রস্তুত করছে। খবর এফটি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বায়ু টারবাইন নির্মাতা এনভিশনের উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার চিফেং শহরের একটি শিল্প পার্কে। বায়ুশক্তি ব্যবহার করে সেখানে ‘গ্রিন অ্যামোনিয়া’ উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি, যা সার ও রাসায়নিক শিল্পে এবং জাহাজের জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তি বিকাশমান হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনভিশনের মতো কোম্পানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন কিছু ইঙ্গিত করছে। কম দামি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে বিশাল শিল্প খাতের বড় একটি অংশকে কার্বনমুক্ত করার পথে এগোচ্ছে চীন।

এসব পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দাম এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি। সাংহাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য ল্যানটাউ গ্রুপের জ্বালানি বিশ্লেষক ডেভিড ফিশম্যানের মতে, বড় পরিসরে গ্রিন অ্যামোনিয়ার উৎপাদন হলে দাম কমবে। সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গিয়েছিল।

বিশ্বের শিল্প উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত রাসায়নিকের একটি অ্যামোনিয়া, এর বেশির ভাগই সার হিসেবে ব্যবহার হয়। বাকি অংশ প্লাস্টিক, বস্ত্র, পরিষ্কারক পণ্য ও খনি শিল্পে বিস্ফোরক তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস বা কয়লার বিকল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে তৈরি হয় গ্রিন অ্যামোনিয়া। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এ তরল সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যায়।

বর্তমানে বৈশ্বিক গ্রিন অ্যামোনিয়ার চাহিদা প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ টন। তবে জাহাজ চলাচল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হলে চাহিদা আরো বাড়বে।

চিফেং প্লান্টে প্রায় ৮০০ কোটি ইউয়ান বা ১১০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে সাংহাইভিত্তিক এনভিশন। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির প্রাথমিক বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩ লাখ ২০ হাজার টন। তারা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে ক্রেতা পেয়েছে। আগামী এক দশকে উৎপাদন বাড়িয়ে ৫০ লাখ টন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কার্বন নিবিড় শিল্পসংশ্লিষ্ট সংস্থা মিশন পসিবল পার্টনারশিপের তথ্য অনুসারে, চীনে চালু বা অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া ৫৪টি বাণিজ্যিক পর্যায়ের পরিচ্ছন্ন শিল্প প্রকল্প রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তিন গুণ বেশি।

চীনের বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্মাতারা এখন পরিষ্কার জ্বালানি ও রাসায়নিক উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে। সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারক লংজি ও বায়ু টারবাইন নির্মাতা গোল্ডউইন্ড ও মিংইয়াং— এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই অ্যামোনিয়া, মিথানল ও জেট জ্বালানিকেন্দ্রিক।

বিকল্প জ্বালানি খাতে চীনের অগ্রগতির আরেকটি উদাহরণ, ইনার মঙ্গোলিয়ার একটি মিথানল কারখানার রূপান্তর। পাঁচ লাখ বর্গমিটার আয়তনের স্থাপনাটি পরিচালনা করছে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত ইউটিলিটি কোম্পানি টাউনগ্যাস, যারা চীনের তিন শতাধিক শহরে গ্যাস সরবরাহ করে। ২০১১ সালে চালু হওয়ার সময় প্রকল্পটি স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত সস্তা কয়লার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে তারা কাঁচামাল হিসেবে পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ার ব্যবহার শুরু করে।

মিথানল বহু পণ্যের মূল কাঁচামাল, যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক, কৃত্রিম কাপড় ও তন্তু, ওষুধ ও কৃষি রাসায়নিক। এটি জাহাজ কোম্পানিগুলোকে ভারী জ্বালানি তেল ও সামুদ্রিক ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রানজিশন অ্যাকসিলারেটরের নির্বাহী পরিচালক ফস্টিন দেলাসাল বলেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মের পরিষ্কার প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে বাণিজ্যিকীকরণে চীন নিঃসন্দেহে এগিয়ে।’

তবে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে মিথানলের স্বল্পমেয়াদি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ‘নেট-জিরো ফ্রেমওয়ার্ক’ গ্রহণে বাধা দেয়, যা কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ এবং জরিমানা আরোপের কথা বলেছিল।

আরও